সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্তঃ বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি

মানবেন্দ্র বটব্যাল, এডভোকেট
আজকের বরিশাল বিভাগ অর্থাৎ বৃহত্তম বরিশাল জেলা ১৭৯৭ সনের আগ পর্যন্ত ছিল ঢাকা জেলার অধীনে। ১৭৯৭ সনের বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক জেলা হিসাবে ঘোষনা করা হয়। তবে ১৮০১ সনের পূর্বে বরিশালে কোন প্রকারের আদালত স্থাপিত হয়নি। বরিশাল কালেক্টরেটের (বর্তমানকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) জন্ম হয় ১৮১৭ সনে। ১৮৬১ সনে বাকেরগঞ্জ জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ও কালেক্টরের পদ একীভূক্ত করা হয়। বাকেরগঞ্জ জেলার সীমানা নির্ধারন করে ১৮৭৪ সনের ১৬ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়। আর বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির জন্মহয় ১৮৮০ সনের ১৭ জুন। ১৮৮৭ সনের বাকেরগঞ্জ জেলাকে ৫টি মহকুমায় বিভক্ত করে সেখানে ৫ জন মহকুমা ম্যাজিষ্ট্রেট নিযুক্ত করা হয়। তাই প্রথমে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি জেলার সকল মামলার আনজীবী নিযুক্ত হবার সুযোগ পেলেও পরবর্তীতে মহকুমা পর্যায়েও আইনজীবী সমিতি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এসময়ে মহকুমা ছিল পটুয়াখালি, পিরোজপুর, ভোলা, দক্ষিন শাহাবাজপুর ও মাদারিপুর।
তৎকালিন জেলা জজ ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ এফ.জে.জি ক্যাম্বেলের সভাপতিত্বে স্থানৗয় পাবলিক লাইব্রেরী মিলনায়তনে একজন ব্যারিস্টার এট. ল. সহ ২৯ জন উকিল ও প্লীডার, ৭ জন মোক্তার এবং জেলা জজ, দু-জন সাব জজ ও ৪ জন মুন্সেফ ছিলেন বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ওই দিনের সভায় বরিশালের কয়েকজন জমিদারও উপস্থিত ছিলেন। সে সময়ে বিচার কার্যক্রমের সাথে সংযুক্ত সরকারি কর্মকর্তারাও সমিতির সদস্য হতে পারতেন। বিচারকদের জন্য ভর্তি ফি ছিল না। তবে তাদেরকে মাসিক নির্ধারিত চাঁদার সাথে বাৎসরিক ১৬/- টাকা চাদা দিতে হত। এছাড়া কোন সদস্য এককালীন ৩০০/- টাকা চাঁদা দিলে তাকে ভর্তি ফি, মাসিক চাঁদা, ওকালতনামার ফি দিতে হতনা। পরবর্তীতে আইনজীবী সমিতির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপতি হন জেলা জজ ও জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ এফ. জে.জি ক্যাম্বেল ও সম্পাদক নির্বাচিত হন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন অনুশীলন পার্টির নেতা মিঃ পি. এন. মিত্র ব্যারিস্টার এট-ল। কমিটিতে পদাধিকার বলে সদস্য হন সরকারী কৌশুলী মিঃ অভয়ানন্দ দাস। পরবর্তীতে আইনজীবীদের মধ্যে প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন পিয়ারী লাল রায় (লাকুটিয়ার জমিদার পরিবারের সদস্য)।
বাংলার গর্ভনর ১৮৭৮ সনের ২২ জুলাই বিভিন্ন আদালতে আইনপেশায় নিয়োজিত প্লিডার ও মোক্তারগন সরকারী জমিতে নিজস্ব ভবন নির্মান করতে পারবে মর্মে ৯৪৫ বি নং আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের প্রেক্ষিতে বরিশাল জেলা আইনজীবী সিমিতির পক্ষ থেকে জেলা জজ আদালত প্রাঙ্গনে আইনজীবী সমিতির ভবন নির্মানের জন্য জমি বরাদ্দ চেয়ে ১৮৮৬ সনের ৫ জুন সরকারের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়। জেলা আইনজীবী সমিতির আবেদনটি বাংলার গর্ভনরের পক্ষে গনপূর্ত বিভাগের সচিব ১৮৯১ সনের ১ এপ্রিল ৭৯৬ বি নং স্মারক পত্রের মাধ্যমে মঞ্জুর করেন। আর সরকারের কাছ থেকে অনুমতি পাবার পর প্রথমে আইনজীবী সমিতির ৪১ জন সদস্য ১৯০০ সনের ২০ জুলাই তারিখে রেজিষ্ট্রিকৃত ২৭৩৭ নং দলিল দ্বারা সরকারের কাছ থেকে কিছু জমি স্থায়ী ইজারা নেন। উল্লেখ্য সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে একমাত্র মুসলিম সদস্য মৌলভী মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী (শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হকের পিতা) ১৯০১ সনের ৯ ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেন। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও অসুস্থতার কারনে ইজারা দলিল সম্পাদন করতে পারেন নি। প্রথমে যে জমি আইনজীবী সমিতির বরাবরে ইজারা দেয়া হয়েছিল তাতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আইনজীবী সমিতির আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে আরো কিছু জমি অধিগ্রহন করা হয়। আর আইনজীবী সমিতির তৎকালীন ৭৪ জন সদস্য ১৯০৩ সনের ১৫ জুন তারিখে রেজিষ্ট্রিকৃত ২৬৭৯ নং দলিল সম্পাদন করে অধিগ্রহনকৃত জমি স্থায়ীভাবে ইজারা নেন। দ্বিতীয় দলিলে আইনজীবী সমিতির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে মরুহুম হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ (খান বাহাদুর হেমায়েতউদ্দিন আহমেদ) এবং এ.কে ফজলুল হকও (শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক) স্বাক্ষরকারী ছিলেন। আর এভাবে আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে জমি অর্জনের পর সমিতির নিজস্ব ভবন নির্মান করা হয়। জানা যায় ওই সময়ে যে জমির উপর সমিতির নিজস্ব ভবন নির্মান করা হয়েছিল তার পূর্বতন মালিক ছিলেন জনৈক রহিমদ্দিন সিকদার। সমিতির সদস্য ছাড়াও স্থানীয় নিজস্ব ভবন নির্মান করা হয়েছিল তার পূর্বতন মালিক ছিলেন জনৈক রহিমদ্দিন সিকদার। সমিতির সদস্য ছাড়াও স্থানীয় জমিদার ও সুধীজনের আর্থিক সহযোগীতায় সর্বমোট ৩,৬৪২/- …… (তিনি হাজার ছয় শত বিয়াল্লিশ টাকা নয় আনা) ব্যয়ে ভবনটি নির্মিত হয় । এই ভবনটির ছাদটি ফেলে বর্তমান ঢালাই ছাদ দেয়া হয়েছে ১৯৮৪ সনে। সমিতির দ্বিতীয় ভবনটি [মূল ভবেনের পূর্বে পাশের দোতলা দালান) নির্মান করা হয় ১৯৭৭ সনে। এটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য মরহুম আলহাজ্ব মোবারক হোসেন সমিতির সাবেক সভাপতি ইউসুফ হোসেন হুমায়নের পিতা ] তৃতীয় ভবন নির্মান করা হয় ১৯৯৬-৯৭ সনে (পিছনের তিন তলা দালানটি)। আইনজীবী সমিতি গঠনের পর আইনজীবীদের কল্যানের জন্য গঠন করা হয়েছিল আইনজীবী সমবায় সমিতি। এটির কার্যক্রম পরিচালিত হত সমিতির সর্ব উত্তরের দালানে। এখন এই সমবায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির ২০১৯-২০ মেয়াদের কার্যকরী পরিষদ নির্বাচন ১৪ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে।